Home অফবিট শারদ উৎসবের প্রাককালে মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির নামে দেবী দুর্গার বিরোধিতায় নামলেন...

শারদ উৎসবের প্রাককালে মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির নামে দেবী দুর্গার বিরোধিতায় নামলেন দলিত নেতাদের একঅংশ

দলিত আন্দোলনকে হাতিয়ার করে নতুন উদ্যমে প্রচার শুরু করলেন পশ্চিমবঙ্গের দলিত আন্দোলনের কিছু নেতৃত্ব। মহিষাসুরকে দলিত অন্ত্যজ সমাজের প্রতিনিধি রূপে তুলে ধরে দুর্গার বিরোধিতায় গড়ে ওঠা মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির পক্ষে প্রচার শুরু করলেন তারা। সমিতির পক্ষ থেকে প্রচারিত লিফলেটে তারা নিজেদের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন,

প্রিয় দেশবাসী,
আপনারা জানেন যে, ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLI হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালের ৪২তম আমেন্ডমেন্টে এই সেকুলার কথাটির ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যেঃ
-“ভারতে সরকারী ভাবে কোন বিশেষ ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
-জনগণ নিজের পছন্দ মত যে কোন ধর্ম পালন করতে পারেন।
– সরকার কোন ভাবেই কোন বিশেষ ধর্মের প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারী টাকা বরাদ্দ করতে পারবে না।
-সরকার কোন বিশেষ গোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুষ্ঠান অথবা উৎসবে অংশগ্রহণ করবে না। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তাই এখানে কোন রাজ্যধর্ম নেই। এখানকার জনগণ শান্তিপূর্ণ ও স্বাধীন ভাবে ধর্ম পালন করতে পারবে”।
সংবিধানের এই নির্দেশিকা নির্বাচিত, এমএলএ, এমপি, মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি প্রভৃতি সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। সাংবিধানিক কোন পদে থেকে প্রকাশ্যে বিশেষ কোন ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করা ভারতীয় সংবিধান বহির্ভূত কাজ। এতে সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের গরিমা বিনষ্ট হয় এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষের বাতাবরণ তৈরি হয়।

গত বছরের মত এবারও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সারা রাজ্যের দুর্গাপূজা কমিটিগুলির জন্য রাজকোষ থেকে টাকা বরাদ্দ করার জন্য নানা মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে জনগণের টাকা উন্নয়নের কাজে ব্যয় না করে কেন উৎসবের আবেগে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে? কেন মহামারী নিয়ন্ত্রণে, কৃষক, শ্রমিকদের সহায়তা প্রকল্পে এই টাকা খরচ করা হচ্ছে না? যেখানে দুর্গা পূজার ভিড়ের কারণে করোনা সঙ্ক্রমণের নিশ্চিত ঝুঁকি রয়েছে সেখানে কেন তিনি মানুষকে সংক্রমণের দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন! রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর এহেন সিদ্ধান্তে বাংলার জনগণ বিভ্রান্ত এবং শঙ্কিত।

অধুনা দুর্গাপূজার থিম পরিকল্পনায় ভোগবাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ঘৃণা এবং অজ্ঞতা যা মানবাধিকারকে বারবার অপমানিত করছে। যেখানে পূজা কমিটিগুলির আচরণে আসবে সংবেদনশীলতা, আসবে সার্বজনীন মানবিকতা, সেখানে সংবিধানের নির্দেশিকাকে কার্যত বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ধর্মের নামে তাঁরা যা করছেন তা কার্যত অসাংবিধানিক এবং অগণতান্ত্রিক। কোন কোন পূজা কমিটি “বঙ্গাসুর বধ” বা “করোনাসুর বধ” বিজ্ঞাপন দিয়ে শুধু অজ্ঞতাই দেখননি এই বঙ্গদেশকে, দেশের মানুষকে ঘৃণা করেছে এবং অপমানিত করেছে।
সাঁওতালী ভাষায় “বঙ্গা” শব্দের অর্থ পবিত্র সত্তা। যে দেশে মাটি উর্বর, জল, বাতাস, আলো এবং সুনীল আকাশ বিরাজমান সে দেশ “বঙ্গা দিশম”। বঙ্গা দিশমের ভাষা অসুর ভাষা। “মঞ্জুশ্রীমূলকল্প” গ্রন্থে পরিষ্কার বর্ণিত হয়েছে “অসুরানাং ভবেৎ বচা গৌড়পুন্ড্রোদ্ভবা সদা”।

বর্তমানে সাঁওতাল, কোল-মুন্ডা, শবর, অসুর প্রভৃতি ৪০টি জনজাতি, চন্ডাল, পৌণ্ড্র, বাগদী, ডোম, ভূমিজ, রাজবংশী প্রভৃতি ৬০টি জাতি এবং ১৪২টি ওবিসি জাতি সকলেই এই অসুরভাষী মানুষ। এদেরই আদিপুরুষ এই বঙ্গাসুর। যিনি সাঁওতাল সমাজে হুদুড় দুর্গা নামে পূজিত হন। যে রাজাকে দেবী নামে এক ছলনাময়ী নারী অন্যায় ভাবে হত্যা করেছিলেন। যিনি এখন দেবী দুর্গানামে পূজিত হন। অসুর, সাঁওতাল সহ বহু মূলনিবাসী সমাজের মানুষ এই সময় দাসায় বা অশৌচ পালন করেন। ভুয়াং নাচের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজাকে খুঁজে বেড়ান।

২০১১ লোকগণনা অনুসারে ভারতের ৭৭টি জেলায় ৩২ হাজারের থেকে বেশি অসুর আদিবাসী বসবাস করেন। ঝাড়খণ্ডে এই আদিবাসীদের সংখ্যা ২০হাজারের থেকে বেশি। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার চাবাগান অঞ্চলে বসবাস করেন প্রায় ৪হাজার অসুর জাতির মানুষ। ভারতের জনগণনায় সর্বপ্রথম যে জাতিটির নাম আছে সেটি অসুর জাতি। পূজার নামে, ধর্মের নামে এই মানুষগুলিকে যদি অশুভ শক্তি বা মহামারীর সাথে যুক্ত করে বধযোগ্য হিসেবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় তবে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ।

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, ১৫শ শতকের শেষ ভাগে বঙ্গদেশে দুর্গাপূজার প্রবর্তন হলেও ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের আগে এই দেশে দুর্গাপূজার কোন প্রচলন ছিলনা। পলাশী যুদ্ধে জয় লাভ করার জন্য শোভাবাজার রাজবাড়ীতে নবনির্মিত এক প্রসাদে শরৎকালে লর্ড ক্লাইভকে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দেবার জন্য, পান ভোজন এবং বাইজী নাচের ফোয়ারা উড়িয়ে বিপুল আয়োজনে দুর্গাপূজার সূচনা করেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। এর পরেই ব্রিটিশদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তোষামোদ করার জন্য জমিদারদের মধ্যে দুর্গাপুজার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় এবং ভোগবাদের এক বাজার সংস্কৃতির আমদানি ঘটে। অধুনা এই দুর্গা পুজা নরহত্যার প্রজেকশনে পরিণত হয়েছে এবং আয়োজকেরা অশুভ শক্তি এবং মহামারীর সাথে অসুর জাতিকে যুক্ত করে শুধু অজ্ঞতা নয় জিঘাংসার বাতাবরণ তৈরি করেছেন। আমরা জয় ভীম ইন্ডিয়া নেটওয়ার্কের পক্ষে এর তীব্র বিরোধিতা করছি।
আমরা দাবী করছি যেঃ
১) অবিলম্বে ধর্মের নামে, পূজার নামে এই নরহত্যার প্রজেকশন বন্ধ করা হোক। শূলবিদ্ধ, পদানত এবং চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে এই মবলিঞ্চিং এর দৃশ্য থেকে মহিষাসুরকে সরিয়ে নেওয়া হোক।
২) মহিষাসুর মর্দিনী নামক নরহত্যার উল্লাসে রচিত গীতি আলেখ্য নিষিদ্ধ করা হোক।
৩) অসুর শব্দ এবং অসুর জাতিকে অশুভ শক্তির সাথে তুলনা করার প্রবণতা বন্ধ করা হোক।
৪) করোনার এই প্যান্ডেমিক অবস্থার সাথে অসুর জাতিকে যুক্ত করে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে তা নিষিদ্ধ করা হোক।
৫) দাসায়, সহরায়, বাদনা, দীপদান প্রভৃতি লোকায়ত শারদ উৎসবগুলিকে আরো বেশি করে মর্যাদা দেওয়া হোক যাতে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির পরিবেশ ফিরে আসে।

মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির পক্ষে
শরদিন্দু উদ্দীপন, অজিত হেমব্রম এবং মিলন নির্ঝর মৃধা

নিজেদের কথা পুজো উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতি, জয়ভীম নেটওয়ার্ক সহ রাজ্যের দলিত সংগঠন গুলি এই লিফলেট ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দলিত সংগঠন গুলি জানাচ্ছেন প্রাচীন কাল থেকেই আদিবাসী বহু জনগোষ্ঠীর কাছে দুর্গাপুজো উৎসবের নয় শোকের সময়। কারণ তারা মনে করেন মহিষাসুর বা হুদুর দূর্গা তাদের সমাজের একজন প্রজাবৎসল রাজা বা নেতা।

শারদ উৎসবের প্রাককালে মহিষাসুর স্মরণ সভা সমিতির নামে দেবী দুর্গার বিরোধিতায় নামলেন দলিত নেতাদের একঅংশ                                         মহিষাসুরের একটি স্মারক স্থল। যেটি ভারত সরকারের আর্কিওলজিক্যাল বিভাগ সুরক্ষিত করে রেখেছে।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

শীর্ষ সংবাদ

- Advertisement -

অন্য রকম